গার্মেন্টস খাতে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সম্ভাবনা, সংকট সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগের তাগিদ
এমএম রহমাতুল্লাহ: দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি ও এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের সহযোগিতাকে এ খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন তারা।
মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় তুলে ধরেন বিজিএমইএর নেতৃবৃন্দ।
সভায় তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন ও রপ্তানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সম্ভাব্য প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিজিএমইএর নেতৃবৃন্দ জানান, দেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ৩ হাজার উদ্যোক্তা এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। ফলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ খাতের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মতবিনিময় সভায় বিজিএমইএর পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি বর্তমান পর্যায় থেকে ভবিষ্যতে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। তবে শিল্পের এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং অবকাঠামোগত ও আর্থিক সমস্যার সমাধান জরুরি বলে তারা জানান।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে শিল্পের সমস্যাগুলো শুনেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিরোধী দলের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। বিজিএমইএর নেতারা জানান, জ্বালানি সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে কারখানার উৎপাদন আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শিল্পের স্বাভাবিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তারা।
ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আলোচনায় আসে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মতবিনিময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন বিজিএমইএর নেতৃবৃন্দ। তাদের মতে, শিল্পের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বিজিএমইএর নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ খাত দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কী ধরনের অবদান রাখছে, বর্তমানে কী সমস্যার মুখোমুখি এবং সম্ভাবনাগুলো কোথায়—এসব বিষয়ে ধারণা নেওয়াই ছিল মতবিনিময়ের মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ খাতের সমস্যা সমাধানে সরকার, বিরোধী দল ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। সরকারের কোনো উদ্যোগ জনস্বার্থে হলে বিরোধী দল হিসেবে তাতে সহযোগিতা করা হবে। আবার জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ নেওয়া হলে তার প্রতিবাদ করা হবে।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর সমাধান খোঁজার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতা করার প্রস্তুতির কথা জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জনগণের স্বার্থ তুলে ধরা এবং সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগে সহযোগিতা করা তাদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে জনগণের ন্যায্য দাবির পক্ষে সংসদ ও রাজপথে কথা বলার কথাও উল্লেখ করা হয়।
দীর্ঘদিন পর বিরোধীদলীয় নেতার আমন্ত্রণে এমন মতবিনিময় সভায় অংশ নিতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন বিজিএমইএর নেতৃবৃন্দ। তারা তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান সমস্যা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
সভায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিজিএমইএর পক্ষে সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান, সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম, মিজানুর রহমান, বিদিয়া অমৃত খান, মো. শেহাব উদ্দুজা চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী এবং সংগঠনের বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা সভায় অংশ নেন।