ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি বিশেষ নীতিমালা, দর্শন ও শরিয়াহভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা। তাই যে কোনো ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির মূল দর্শন, উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাত দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। বিপুল সংখ্যক গ্রাহক তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক অর্থনৈতিক চর্চার প্রত্যাশা থেকে ইসলামী ব্যাংকে আমানত রাখেন এবং বিনিয়োগ গ্রহণ করেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের থাকা প্রয়োজন, যারা শুধু ব্যাংকিং প্রশাসন বা করপোরেট ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নন, বরং মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা, ইজারা, সালাম, ইস্তিসনা এবং শরিয়াহ গভর্ন্যান্সের মতো ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন।
দুঃখজনকভাবে অনেক সময় দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য, গোষ্ঠীগত স্বার্থ, করপোরেট প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের স্বাতন্ত্র্য ও নীতিগত বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে শরিয়াহসম্মত কার্যক্রম নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের অনুকরণে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশ্বের সফল ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা শুধু আর্থিক লাভের বিষয় নয়; এটি আমানতকারীদের আস্থা, শরিয়াহ অনুসরণ এবং নৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কিংবা প্রধান নির্বাহী যদি ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ের মৌলিক দর্শন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখেন, তাহলে শরিয়াহ কমিটির সুপারিশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমান সময়ে ইসলামী ব্যাংকিং খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে সুশাসনের প্রশ্ন, অন্যদিকে শরিয়াহ পরিপালনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ অবস্থায় নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারণে বিশেষ মানদণ্ড প্রণয়ন করা জরুরি। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জন্য ইসলামী ব্যাংকিং, ইসলামী অর্থনীতি এবং শরিয়াহ গভর্ন্যান্স বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, সনদ বা অভিজ্ঞতাকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ইসলামী ব্যাংকের শক্তি তার গ্রাহকদের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে হলে নেতৃত্বের আসনে এমন ব্যক্তিদের বসাতে হবে, যারা ইসলামী ব্যাংকিংকে কেবল একটি ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে নয়, বরং একটি নীতিনিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে উপলব্ধি করেন। ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও প্রতিশ্রুতি ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের কার্যকর নেতৃত্ব কল্পনা করা কঠিন। তাই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়োগে ইসলামী ব্যাংকিং জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুধু একটি ভালো উদ্যোগ নয়, বরং খাতটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও টেকসই বিকাশের জন্য অপরিহার্য শর্ত।
মো: মুখলেছুর রহমান।
ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার,
উপদেষ্টা, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স, ঢাকা, বাংলাদেশ।