লায়ন উমার রাযী: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বহুল প্রচলিত সত্য কথা রয়েছে "রাজনীতিতে কোনো কাকতালীয় ঘটনা বলে কিছু নেই।" বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এই উক্তির সত্যতা বারবার প্রমাণের মুখোমুখি দাঁড়ায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে হঠাৎ তৈরি হওয়া কিছু উগ্র ও বিতর্কিত তৎপরতা আমাদের এক অন্ধকার অতীতের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়-
আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগের একটি ঘটনা স্মরণ করা যাক। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যখন দ্বিপাক্ষিক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফরে চীনে অবস্থান করছিলেন, তখন বেইজিংয়ের সাথে বাংলাদেশের বড় ধরনের কিছু কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সফরের ঠিক দ্বিতীয় দিনে ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ঘটনা। একযোগে দেশের ৬৪টি জেলায় বোমা হামলা চালানো হলো। তথাকথিত 'ইসলাম কায়েম' এর নামে চালানো সেই সিরিজ বোমাবাজির মূল শিকার হলো বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। ইসলাম কায়েম তো দূরের কথা, চীনের সাথে সেই কাঙ্ক্ষিত চুক্তিগুলো বাতিল হয়ে গেল এবং প্রধানমন্ত্রী সফর স্থগিত করে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। পর্দার আড়ালের মাস্টারমাইন্ডরা সেদিন সফল হয়েছিল।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট-
দীর্ঘ ২২ বছর পর, আজ যখন সেই ঘটনার ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (তারেক রহমান) তাঁর প্রথম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সফরে চীন যাচ্ছেন, ঠিক তখনই ঢাকার রাজপথে আবার এক অদ্ভুত ও পরিকল্পিত অস্থিরতার আভাস দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যত কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সফরের ঠিক আগমুহূর্তে মাঠে নামানো হয়েছে দুটি চরমপন্থী ও কট্টরপন্থী গ্রুপকে- যার একটি কট্টর হিন্দুত্ববাদী এবং অন্যটি কট্টর মুসলিম(?) ভাবাদর্শের।
এক পক্ষ সংখ্যালঘুদের অধিকারের আড়ালে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছে যে, দাবি না মানলে দেশ ধ্বংস করে ফেলা হবে। অন্যদিকে, আরেক পক্ষ হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক কোনো ক্রীড়া আসর বা বিশ্বকাপকে 'ইসলামবিরোধী' আখ্যা দিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। প্রশ্ন জাগে এই দুই বিপরীতমুখী মেরুর উগ্রতা কেন ঠিক প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পূর্বমুহূর্তেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল? কেন এর টাইমিং এতটা নিখুঁত?
নাটাই কার হাতে?-
একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়, এটি কোনো আকস্মিক সামাজিক বা ধর্মীয় জাগরণ নয়। এই উগ্রতার পেছনে ধর্ম বা অধিকার রক্ষার কোনো প্রকৃত সদিচ্ছা নেই। এদের মূল উদ্দেশ্য ঢাকার নীতি-নির্ধারকদের মনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা। আর এই পুতুলনাচের সুতো বা নাটাইটি মূলত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র দিল্লির আঙিনা থেকে।
বাংলাদেশ যখনই নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থে দিল্লির বলয় বা 'গ্রিপ' থেকে কিছুটা বেরিয়ে বেইজিংয়ের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের দিকে পা বাড়াতে চায়, তখনই আঞ্চলিক আধিপত্যকামী শক্তিগুলো ডেসপারেট বা মরিয়া হয়ে ওঠে। এই উগ্রপন্থী গ্রুপগুলো মূলত দিল্লির সেই 'চোখ রাঙানি' এবং প্রচ্ছন্ন বার্তারই মাঠপর্যায়ের প্রতিফলন। এরা আসলে ধর্ম বা অধিকারের দাওয়াত দিচ্ছে না, এরা দিচ্ছে দিল্লির স্বার্থের দাওয়াত।
চ্যালেঞ্জ ও আমাদের করণীয়-
শোনা যাচ্ছে, আসন্ন এই সফরে চীনের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মেগা-প্রজেক্টের চুক্তি সই হতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই দিল্লির উদ্বেগ ও তৎপরতা দিন দিন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তারা কোনোভাবেই ঢাকাকে তাদের হাতের মুঠোর বাইরে যেতে দিতে রাজি নয়।
এখন দেখার বিষয় হলো, অতীতের সেই তিতা অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং দিল্লির এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপকে উপেক্ষা করে সরকার বেইজিং সফর থেকে দেশের জন্য কতটুকু স্বনির্ভরতা ও জাতীয় স্বার্থ আদায় করে আনতে পারে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের তুষ্টির ওপর নির্ভর করতে পারে না।
আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর এই নোংরা দাবার চাল থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা পাক এবং জাতীয় স্বার্থে যেকোনো চোখ রাঙানি উপেক্ষা করার মতো রাজনৈতিক সাহস ও প্রজ্ঞা আমাদের নেতৃত্ব প্রদর্শন করুক- এটাই আজ কোটি বাঙালির প্রার্থনা। আল্লাহ্ আমাদের সহায় হোন।
লায়ন উমার রাযী।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক