ফিরোজ মাহবুব কামাল: দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে ভারতীয়রা স্বাধীনতা পায় ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট। এ দিনটি ভারতের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন। তাই তারা সে দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস রূপে মহা ধুমধামের সাথে পালন করে। তারা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে সেসব মহান নেতাদের কথা যারা সে স্বাধীনতা অর্জনে নির্যাতিত হয়েছিল, কারাবন্দী হয়েছিল এবং নিহত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তানিরা ব্রিটিশের শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। পাকিস্তানের ইতিহাস এ দিনটিও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। তারাও এই দিনটিকে মহা ধুম ধামে উদযাপন করে। পাকিস্তানকে তারা আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত মনে করে এবং শোকর আদায় করে। যারা সে স্বাধীনতার লড়াইয়ের সাথে জড়িত ছিল তাদের স্মরণ করে।
উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সবচেয়ে বেশি কাল যাবত ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের গোলাম ছিল বাঙালি মুসলিমরা। তাদের গোলামীর মেয়াদ ছিল ১৯০ বছরের। বাংলার স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের পর। অপর দিকে দিল্লির মোগল শাসনের বিলুপ্তি ঘটে ১৮৫৭ সালে। অতএব বাঙালির গোলামীর মেয়াদ দিল্লি ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের মানুষের গোলামীর চেয়ে ১০০ বছর বেশি। এর অর্থ, ব্রিটিশদের হাতের সবচেয়ে নির্যাতিত হয়েছিল বাঙালি মুসলিমগণ। অর্থনৈতিক ভাবে তাদের মেরুদণ্ড ভাঙা হয় জমির মালিকানা কেড়ে নিয়ে। ব্রিটিশরা বাংলার বিখ্যাত মসলিন, মখমল ও রেশম শিল্পকে ধ্বংস করে নিজের পণ্যের বাজার বাড়াতে। ওয়াকফ জমি কেড়ে নিয়ে মাদ্রসাগুলি বিলুপ্ত করা হয়।
বাঙালি মুসলিমদের ঘাড়ে ছিল গোলামীর দুটি জোয়াল। একটি ছিল ব্রিটিশদের, আরেকটি হিন্দু জমিদারদের। জমিদারদের শোষণ ও জুলুম ছিল ব্রিটিশদের চেয়েও নৃশংস। বাঙালি মুসলিমরা সে ১৯০ বছরের গোলামি থেকে মুক্তি পায় ১৯৪৭ এর ১৪ই আগস্ট। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি মুসলিমরা কৃষি জমির উপর মালিকানা পায়; ফলে কৃষকরা সন্তানদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর আর্থিক সক্ষমতা পায়। বিপুল সংখ্যক মেধাবী ছাত্রদের জন্য ছিল বেতন মাফ ও পর্যাপ্ত স্টাইপেন্ড। স্থাপিত হতে থাকে স্কুল, সরকারি কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ ও বিশাল বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। নির্মিত হতে থাকে পাট কল, বস্ত্র কল, কাগজের কল, ইস্পাত শিল্প, ঔষধ কারখানা ও অস্ত্র কারখানা। পূর্ব পাকিস্তান এগিয়ে যাচ্ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও অধিক দ্রুত গতিতে। উন্নয়ন দেখতে কোরিয়ান আসতে। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে আর কোন দিনই এতো দ্রুত এতো উন্নয়ত হয়নি -যা পাকিস্তানের ২৩ বছরে হয়েছে।
কি পরিতাপের বিষয়, বাঙ্গালি মুসলিমদের কাছে ১৪ই আগস্ট আজ আর কোন গুরুত্বপূর্ণ দিন নয়। অথচ ইখতিয়ার মহম্মদের বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে বঙ্গ বিজয়ের পর ১৪ আগস্টের স্বাধীনতা অর্জনই ছিল বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে গৌরবজনক দিন। পাকিস্তান অর্জিত হয়েছিল পবিত্র ২৭ রমজানের রাতে। তাই ১৪ আগস্ট ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামতপূর্ণ দিন। অথচ বাঙালি মুসলিমরা এতটাই আত্মঘাতী ও নিমকহারাম যে তারা ১৪ই আগস্টের নিয়ামতভরা দিনটিকে তারা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। তাদের স্মরণে এখন আর ১৪ই আগস্ট বেঁচে নাই। যেন বাঙালি মুসলিমদের ইতিহাসে ১৪ আগস্ট কোন গুরুত্বপূর্ণ দিনই নয়। তাই এদিন নিয়ে বাঙালি মুসলিমদের মাঝে কোন উদযাপন নাই। যারা সে স্বাধীনতার লড়াইয়ের সাথে জড়িত ছিল তাদের কথাও তারা ভুলে গেছে। আল্লাহর এতো বড় নেয়ামতের সাথে এর চেয়ে বড় নিমকহারামি আর কি হতে পারে? বরং তাদের কাছে অতি গর্বের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে ভারতীয় পৌত্তলিকদের সাথে পাকিস্তান ভাঙা এবং ১৯৭১য়ের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্যদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের অধিকৃতি। গণতন্ত্রের শত্রু ফ্যাসিস্ট মুজিব, ভারতীয় এজেন্ট তাজুদ্দীন ও সিরাজুল আলম খান হলো তাদের পূজনীয় নেতা।
অথচ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বাঙালি মুসলিমরা। মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকা শহরে। মুসলিম লীগের রাজনীতির ঘাঁটি ছিল অবিভক্ত বাংলা। বাঙালি মুসলিমের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো ১৯৪৭ এর ১৪ই আগস্ট পাকিস্তানের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি। দেশটি ১৯৭১’য়ের যুদ্ধে তার অখণ্ডতা বাঁচতে পারলে পরিণত হতো চীন ও ভারতের পর তৃতীয় বৃহত্তম পারমানবিক শক্তি। এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে বাঙালি মুসলিমরা সুযোগ পেত দেশটির চালকের আসনে বসার। পাকিস্তানের ২৪ বছের ৪ জন প্রধানমন্ত্রী, ২ জন রাষ্ট্রপতি এবং ৩ স্পীকার ছিল বাঙালি। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং প্রধান নির্বাচনি কমিশনারও হয়েছে বাঙালি। বাস্তবতা হলো, বাঙালি মুসলিমের জন্য স্বাধীনতার দিবস বলে কোন দিবস যদি থেকেই থাকে তবে সেটি হলো ১৪ আগস্ট, ২৬ মার্চ বা ১৬ আগস্ট নয়। প্রশ্ন হলো, যে জাতি তার নিজের ইতিহাস ভুলে যায় এবং সবচেয়ে গৌরবজনক স্মৃতিকেও স্মৃতি থেকে মুছে ফেলে, তারা কি কখনো গৌরবজনক ইতিহাস নির্মাণ করতে পারে? তাদের সামনে কি কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকে? ১৪ই আগস্ট ২০২৬।