ফিরোজ মাহবুব কামাল: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। বিস্ময়ের বিষয় হলো, ১৯৭১ নিয়ে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ভাবতে রাজি নয়, কিছু লিখতে রাজি নয় এবং কিছু পড়তেও রাজি না। এ বিষয়টি আমি দীর্ঘদিন ধরেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সেটি আরো বুঝতে পেরেছি ১৯৭১ প্রসঙ্গে দুইখানি বই লিখে।
১৯৭১ নিয়ে যত আগ্রহ, যত লেখালেখি ও যত পড়াশোনা তা যেন বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী সেকুলারিস্ট, হিন্দুত্ববাদের অনুসারী ও বাম ধারার লোকদের। বাংলা ভাষায় একাত্তরের উপর যত বই লেখা হয়েছে সম্ভবত তার শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি বই লেখা লিখেছে তারাই। এসব বইয়ের পাঠকও তারাই। এভাবে দ্বারা ১৯৭১কে বাংলাদেশের মানুষের মনে বাঁচিয়ে রেখেছে।
ইসলামপন্থীরা ১৯৭১কে ভুলে থাকতে চায়। কারণ, ১৯৭১ তাদের কাছে নেগেটিভ ও পরাজয়ের বিষয়। এজন্যই তারা ১৯৭১ কে ভুলে থাকতে চায়। ভুলে থাকার মধ্যেই তারা তৃপ্তিবোধ করে।
ইসলামপন্থীরা আরো মনে করে জনগণও ১৯৭১কে ধীরে ধীরে ভুলে যাবে। এবং মনে করে জনগণ ১৯৭১ কে ভুলে গেলেই তাদের লাভ। অথচ ৭১ ইসলাম পন্থীদের জন্য দারুন পজিটিভ বিষয় হতে পারত যদি তারা এর উপরে তারা চিন্তাভাবনা করতো এবং নিজেদের অনুকূলে বয়ান তৈরি করতে পারত। কিন্তু সে চেষ্টা তার আদৌ করেনি।
বুঝতে হবে, ইতিহাস কখনো বিলুপ্ত হয় না। এবং ইতিহাসকে কখনো কবর দেয়া যায় না। ইতিহাস যুগ যুগ বেঁচে থাকে এবং মানুষের মনকে আন্দোলিত করে।বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ শত শত বছর বেঁচে থাকবে। ১৯৭১কে ঘিরে ভারতসেবী সেকুলার ফ্যাসিস্ট ও
ইসলাম বিরোধীরা যে বয়ান খাড়া করেছে সেটিকে তারা যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখবে।
একাত্তরের এ ভারতসেবী সেকুলার বয়ানের মোকাবেলা না করলে এবং সেটিকে দাফন না করলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা কম। ১৯৭১ নিয়ে আমি দুইখানা বই লিখেছি সে রূপ ভাবনা ও তাড়না নিয়েই। কিন্তু মনে হচ্ছে এক্ষেত্রে আমি একাকী সৈনিক।
আমার লেখা বই দুটো হলো: একাত্তরের ইতিহাস এবং প্রসঙ্গ একাত্তর। দুটি বই-ই গবেষণামূলক, অনেক তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে লেখা।
এ বই দুটি ১৯৭১ নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে ইসলামপন্থীদের হাতে অস্ত্র হতে পারতো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা এখন শুধু রাজনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে নাই। তাদের সে বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাও নাই। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের অস্ত্রের কথা নিয়ে তারা ভাবেনা।
বাংলাদেশের চিন্তা বিমুখ এই পরিবেশে আমায় বই ব্যর্থ হয়েছে ইসলামপন্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। ইসলামপন্থীদের দৃষ্টি এখন বইয়ের দিকে নেই। তাদের দৃষ্টি কেবলই ভোটের দিকে ও সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ভুলে যায়, বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে বিজয়ী না হলে রাজনৈতিক যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া যায় না। ইতিহাস বার বার সেটি প্রমাণ করেছে যে, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে বিজয়ী হয়, তারাই বিজয়ী হয় রাজনৈতিক যুদ্ধে।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের এ বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে হবে। তাদের আরো বুঝতে হবে, প্রতিটি দেশেই থাকে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। তারা নিজেরা এ যুদ্ধে না থাকলেও যুদ্ধ থামেনা। অন্যরা সে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। যারা চালিয়ে যায় তারাই বিজয়ী হয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের অস্ত্র হলো বই। জিততে হলে তাই বেশি বেশি বই চাই। যাদের বইয়ের অস্ত্র বেশি তারাই এ যুদ্ধে বিজয়ী হয়।২১।৬।২০২৬