আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সমাজকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে পুলিশের হত্যা পাকিস্তানে নতুন করে মানবাধিকারের প্রশ্ন উত্থাপন করছে। ৩২ বছর বয়সী ডাক্তার শাহ নওয়াজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অপমান ও ধর্মবিরোধী কন্টেন্ট সোশাল মিডিয়ায় প্রচার করার। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সিন্ধ অঞ্চলে তাকে গ্রেপ্তার করার সময় বিরোধিতা করলে পুলিশ তাকে গুলি করে। কিন্তু নওয়াজের পরিবারের মতে, এই অভিযোগ মিথ্যা। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল সে এবং হেফাজতে থাকাকালীন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে তাদের অভিযোগ। কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছিল, নওয়াজ আত্মপক্ষের কথা বলার সুযোগ পাবেন, জানায় তার পরিবার। এই নিয়ে একই সপ্তাহে এমন দুটি মৃত্যু হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর বালুচিস্তান অঞ্চলে একই অভিযোগে থানায় আটক থাকা ৫২ বছর বয়সী এক পুরুষকে হত্যা করা হয়। এই হত্যার নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তানের মানবাধিকার সংগঠন এইচআরসিপি। একটি বিবৃতিতে তারা জানায় যে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থাকা দুজনের বিচারবহির্ভূত হত্যা বিষয়ে তারা চিন্তিত। ধর্ম অবমাননার ঘটনাগুলিতে যে সহিংসতার ধারা দেখা যাচ্ছে, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মীরা অভিযুক্ত, সেটি খুবই উদ্বেগের বিষয়। পাকিস্তানে ইসলাম ধর্মের সমালোচনা বা নিন্দা করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও আইনের এই ধারায় এখন পর্যন্ত কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি, কিন্তু বেশ কয়েকটি ঘটনায় উত্তেজিত জনতা বিচারের কাজ শুরু হবার আগেই অভিযুক্তকে মেরে ফেলে। গত কয়েক বছরে এমন ঘটনার হারও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই শুধু অভিযোগ ওঠার কারণেই প্রাণ হারান অনেকে। গত বছর পাঞ্জাব রাজ্যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকে উত্তেজিত জনতা একটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকায় হামলা করে কয়েকটি গির্জা পুড়িয়ে দেয়। শত শত মানুষ বাসা ছাড়তে বাধ্য হন। স্থানীয় খ্রিষ্টান বাসিন্দাদের মতে, এই ঘটনায় অভিযুক্তদের এখনও বিচার হয়নি। ২০১১ সালে পাকিস্তানে এই আইনের সংশোধনের পক্ষে থাকা পাঞ্জাবের সাবেক গভর্নর সলমান তাসীরকে তার নিজের দেহরক্ষীই খুন করে। ওয়াশিংটন ডিসির গবেষণা সংস্থা উডরো উইলসন সেন্টার ফর স্কলার্সের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, এই ধরনের ঘটনাগুলি আসলে রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানে অনিচ্ছা বা অপারগতা, সমাজে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় শক্তির গভীর প্রভাবের মিশ্র ফল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে ব্যক্তিগত ঝগড়া বা ক্ষোভ মেটাতেও অনেকে ব্যবহার করেন বলে জানা গেছে। পাকিস্তানে সংখ্যালঘু অধিকারকর্মী রুথ স্টিফেনের মতে পাকিস্তানের সরকার ধর্মীয় মৌলবাদীদের সংগঠিত করে ও উৎসাহ দেয়, যাতে করে এই সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের সূত্রপাত হবে, ১৯৮০ সাল থেকে সামরিক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রনেতা জিয়ার আমলে যেভাবে আইন ও আইনি প্রক্রিয়াকে বেআইনি ও অসাংবিধানিকভাবে কাটাছেঁড়া করা হয়, তার পর্যালোচনা ও সংস্কার থেকে। মানবাধিকার আইনজীবী তাহিরা আবদুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, আদালতে যাবারই দরকার নেই, শুধু গণপরিসরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করলেই হলো। সেটাই উত্তেজিত জনতাকে আরো উসকানি দেবে যাতে তারা আদালতে মামলার অপেক্ষা না করেই অভিযুক্তকে মেরে ফেলে। মানবাধিকার কমিশন এইচআরসিপি দাবি জানিয়েছে এই ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করুক সরকার। কিন্তু কুগেলমানের মতে, ইসলামিস্ট মৌলবাদীরা পাকিস্তানের রাজনীতিতে বহু ক্ষমতার অধিকারী। তার মতে, নাগরিক ও সামরিক নেতৃত্ব কোনোদিনই তাদেরকে রাগাতে চায়নি। পাকিস্তানের ইতিহাসজুড়ে আমরা দেখেছি যে, যারা ধর্ম অবমাননা আইনের ফায়দা নেয় বা যারা এই আইন ভঙ্গকারীদের প্রতি সহিংসতা সমর্থন করে, তাদের বিষয়ে রাষ্ট্র সব সময়েই খুব সাবধানী থেকে এসেছে।