আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গতকাল বৃহস্পতিবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরাইলী বাহিনীর প্রথম দিনে পৃথক তিনটি স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রথম দিনের সংঘর্ষে অন্তত আটজন ইসরাইলী সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ডজনের বেশি সেনা। লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরাইলী বাহিনী। তবে এ অভিযান শুরু করে প্রথম দিনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। লেবাননের সীমান্তের ভেতরে প্রবেশ করে আবার পিছু হঠেছে তারা। এছাড়া সেনা থেকে শুরু করে ট্যাংকও গুড়িয়ে দিয়েছে হিজবুল্লাহ। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বৈরুতের উপকণ্ঠে এবং বেকা, বালবেক-হারমেল ইসরাইলী হামলায় ৪৬ জন নিহত ও ৮৫ জন আহত হয়েছেন। আলজাজিরা জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর হামলায় আহতদের বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননের সঙ্গে ইসরাইলী সেনাদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল। যদিও বিষয়টি আগে থেকেই অনুমেয় ছিল, কেননা ২০০৬ সালে সবশেষ তারা মুখোমুখি হয়েছিল।
ইসরাইলী সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ২০০ রকেট ছুঁড়েছে লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহ। ইসরাইলী সেনাপ্রধান হারজি হালেভি বলেন, ইসরাইল পাল্টা জবাব দেবে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে পারে।
এর আগে হিজবুল্লাহ জানায়, তারা ইসরাইলের তিনটি ট্যাংক গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ট্যাংকগুলো লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রামের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বুধবার এগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত এ গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা রকেটসহ তিনটি মারাকোভা ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেছে। এসব ট্যাংক মারুন আল-রাস গ্রামের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এলাকাটিতে সকাল থেকেই ইসরাইলী সেনাদের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ হয়ে আসছে। এদিকে, হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ার কথা জানালেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র যেসব স্থানে আঘাত হেনেসে সেসব স্থানে ছবি বা ভিডিও প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনী।
আইডিএফ মুখপাত্র রিয়ার এডমিরাল ড্যানিয়েল হাগারি মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্স-এ জানান, যেসব নাগরিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলাস্থলের অবস্থান প্রকাশ করছে বা যেসব এলাকা ধ্বংস হয়েছে তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করে প্রচার করছে তারা শত্রুকে সাহায্য করছে। ইসরাইলকে রক্ষার দায়িত্ব তার নাগরিকদের হাতে। ইসরাইল কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবে না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন হামলার ভিডিও বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, নেভাতিম ঘাঁটিতে অন্তত কয়েক ডজন মিসাইল ছুড়েছে ইরান। যেগুলো একের পর এক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে দেখা গেছে। ইরান দাবি করছে এ হামলায় ইসরাইলের বেশ কয়েকটি এফ-৩৫ বিমান ধ্বংস হয়েছে, যদিও ইসরাইল এমনটা অস্বীকার করছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন, হিজবুল্লাহ যেন আর ইসরাইলী নাগরিকদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করা তার সরকারের দায়িত্ব। বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহু সরকার হয়তো হিজবুল্লাহর শক্তি ও সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করছে এবং ইসরাইল আবারও লেবাননে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
যুদ্ধের প্রস্তুতি: যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে ইসরাইলী সামরিক বাহিনীর প্রধান হারজি হালেভি হিজবুল্লাহর বিপক্ষে লড়াইয়ে আরও পেশাদার ও অভিজ্ঞ বাহিনী পাঠানোর ঘোষণা দেন।
যুদ্ধের লক্ষ্য: সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের সিনিয়র ফেলো নাবিল খুরি আল জাজিরাকে বলেন, বর্তমান সংঘাতে ইসরাইলের লক্ষ্য শুধু হিজবুল্লাহর মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ করছে না।
তিনি বলেন, সামরিকভাবে তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্য বেছে নিয়ে কিছু লোককে হত্যা করতে পারে। তবে তাদের লক্ষ্য তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। তারা গাজা, পশ্চিম তীরের জন্য এবং এখন স্পষ্টভাবে লেবাননের জন্য একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
‘সুতরাং আমি মনে করি না যে এটি (লেবাননের) মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত অভিযান হবে এবং এটি অবশ্যই ইসরাইলের জন্য সহজ হবে না। এটা কঠিন হবে এবং লেবাননে তারা যে ধরনের প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে তাতে ইসরাইলী সামরিক বাহিনী না চাইলেও সেখানে দীর্ঘ সময় থাকতে বাধ্য হবে’, বলেন খুরি।
শেষ পর্যন্ত ইসরাইলী সামরিক বাহিনী হিজবুল্লাহর হুমকি দূর করার জন্য একটি ‘সীমিত’ অভিযান পরিচালনার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যদিও হিজবুল্লাহর হুমকি দূর করার যে লক্ষ্য এটি বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
সম্প্রতি ইসরাইলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে দখলদার দেশটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ইসরাইলের বড় বড় নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকের মাঝেও। এমনকি ইসরাইলী যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও নাকি ভয় পেয়েছিলেন! এরই মাঝে কিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করা হয়। যেখানে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে একটি বাঙ্কারের হলওয়েতে দৌড়াতে দেখা যায়।
‘ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার মুখে ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে দৌড়ে পালাচ্ছেন’, এমনটাই দাবি করা হয় একটি পোস্টে।
অন্য একটি পোস্টে বলা হয়, ‘কেউ দয়া করে নেতানিয়াহুকে লুকানোর জন্য একটি জায়গা খুঁজে দিন। তিনি নিজের জীবন বাঁচাতে বাঙ্কারে লুকিয়ে পড়ছেন। তার দেশের নাগরিকদের অনিরাপদ রেখেই নিজে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যাচ্ছেন’। তবে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটি অন্তত তিন বছর পুরোনো বলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২১ সালে এক ফেসবুক পোস্টে একই ভিডিও শেয়ার করা হয়েছিল। যে ভিডিওতে মূলত ইসরাইলের জাতীয় সংসদ নেসেটের হলওয়েতে নেতানিয়াহুর দৌড়ানোর দৃশ্য দেখানো হয়।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বুধবার বলেন, ‘ইরান মঙ্গলবার রাতে একটি বড় ভুল করেছে এবং তারা এর চড়া মূল্য দেবে। যারা আমাদের ওপর আক্রমণ করে, আমরা অবশ্যই তাদের ওপর আক্রমণ করি’।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (ওজএঈ) দাবি করেছে, ইসরাইলের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ৯০ শতাংশই অভীষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। সূত্র: এনডিটিভি
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। তবে ইসরাইল যদি ফিলিস্তিন এবং লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ না করে, তাহলে ভবিষ্যতে ইরান আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
দুই দিনের সরকারি সফরে কাতারে গিয়েছেন পেজেশকিয়ান। সেখানে গতকাল বুধবার কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে বৈঠকের সময় এই ইস্যুতে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। বৈঠক শেষে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমার এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য দুটি— প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে কাতারের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা এবং দ্বিতীয়ত মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কাতারের আমিরের সঙ্গে মতবিনিময়।”
“মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমি কাতারের আমিরের কাছে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। আমি বলেছি, ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে নিরীহ বেসামরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তারা যদি এই তৎপরতা থেকে সরে না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে তাদেরকে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।”
এই হামলার জবাব দিতে এবং জিম্মিদের উদ্ধার করতে ওই দিন থেকেই গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।